স্টাফ রিপোর্টার
একের পর এক ধর্ষন পরবর্তীতে হত্যার ঘটনা ঘটছে।ঘটনার পর আমরা সবাই প্রতিবাদে করি, বিচারের দাবী তুলি।কেউ কেউ আবার ধর্ষনকারীকে হত্যা করতে বা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহ দিয়ে থাকি।এরপর ধীরে ধীরে প্রত্যেকেই যার যার জীবনে ফিরে যাই, ব্যস্ততায় ভুলে যাই এসব কিছুই।আবার কোন এক নরপশু কোন এক শিশুকন্যাকে চিরে খেলে আবার আমরা জাগবো অত:পর আবার ভুলে যাবো।এভাবেই চলছে আমাদের জীবন।কিন্তু আর কত? হয় একেবারে অনুভূতিহীন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন চিরদিনের জন্য, নয়ত জেগে উঠুন ধর্ষনের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে।
আর কত বাবা মা তার সন্তানের এমন বীভৎস মৃত্যু দেখার আতংকে থাকবে, আর কত কোমল শিশুটিকে চিরে খাবে হায়নার দলেরা।আমরা কি কিছুই করার ক্ষমতা রাখিনা! সরকার উপর আস্থা রাখার কিছু নেই এখন সময় নিজেদের পরিবার নিজেদেরকেই সুরক্ষা দেবার, নিজেদের সমাজকে নিজেদেরকেই সুরক্ষা দেবার উদ্যোগ নিতে হবে।পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।এছাড়া মুক্তির পথ দেখিনা।আর কত অভিযোগের পর অভিযোগ করব, আর কত দাবী নিয়ে পথে নামবো! তারচেয়ে আমরা প্রতিরোধব্যবস্থা ও সচেতনতা গড়ে তুলি নিজ পরিবারে, গ্রামে, পাড়া, মহল্লায়, সমাজে।
বর্তমানে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যা। শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পেছনে কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ কাজ করে না; বরং এটি অনেকগুলো জটিল সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং কাঠামোগত সমস্যার সমষ্টি।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ২০২৫-২৬ সালে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া বেশ কঠিন, তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে ভয়াবহ চিত্রের ধারণা পাওয়া যায়।জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসেই দেশে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় এবং ১৫ জন শিশু ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।২০২৪ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সমীক্ষা অনুযায়ী, মোট ৩৬৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ২২০ জনই ছিল শিশু (কন্যাশিশু)।
আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী)।
বাস্তবে সাজার হার কত জানেন?
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলোতে সাজার হার মাত্র ৩%। এর বিপরীতে প্রায় ৭০% মামলাতেই আসামিরা খালাস পেয়ে যান।
আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগে এবং প্রতি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ে।মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্তে ধীরগতি, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং দুর্বল প্রমাণ সংগ্রহ। এছাড়া সামাজিক কলঙ্ক ও ভয়ের কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার মামলা পর্যন্ত যেতে চায় না।
ধর্ষণের ঘটনার পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো ‘অপরাধ করার পর পার পেয়ে যাওয়ার’ নিশ্চয়তা।
- ভয়হীনতা: অপরাধীরা যখন দেখে যে মামলা দায়ের হলেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অভাব বা প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে তারা মুক্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করে না।
- সাক্ষীর নিরাপত্তা ও হয়রানি: বিচার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার অনেক সময় উল্টো সামাজিকভাবে হেনস্তা বা হুমকির শিকার হয়, যা অপরাধীদের উৎসাহিত করে।
যেকারনে ধর্ষকের জন্ম হয় তার মধ্যে অন্যতম কারন সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়।পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেটে অনিয়ন্ত্রিত অশ্লীল কনটেন্ট দেখার ফলে অনেক তরুণ বা বয়স্কের মধ্যে মানসিক বিপর্যয় ও বিকৃত যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হচ্ছে।
- নৈতিক শিক্ষার অভাবে পারিবারিক পর্যায়ে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা এবং ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করার অভাব রয়েছে। অনেক অভিভাবক বিষয়টি নিয়ে কথা বলাকে লজ্জা বা ট্যাবু মনে করেন।
- যে সময়ে শিশুরা ঝুকিতে থাকে অর্থাৎ শিশুরা একা খেলতে গেলে, স্কুলে যাতায়াতের পথে বা পরিচিত কারো বাড়িতে থাকাকালীন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে।অভিভাবকরা অনেক সময় পরিচিত মানুষের ওপর অতিরিক্ত বিশ্বাস রেখে অসতর্ক হয়ে পড়েন।
- জনশূন্য বা অন্ধকার স্থান বা রাস্তায়, পরিত্যক্ত জায়গা যেখানে মানুষের নজরদারি নেই, বা মানুষের চলাচল কম থাকে, সেখানে অপরাধীরা তাদের শিকার খুঁজে নেয়। তাই অন্ধকারচ্ছন্ন জায়গাতে আলোর ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনে সিসিটিভি ক্যামেরা বা নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা রাখলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
- ডিজিটাল ফাঁদে ফেলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অপরিচিতদের সাথে সম্পর্ক তৈরি হওয়া এবং পরবর্তীকালে সেই সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং বা শারীরিক নির্যাতনের বা ধর্ষনের ঘটনা ব্যাপক হারে বাড়ছে।
- রাজনৈতিক ও ক্ষমতার প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকে। স্থানীয় রাজনীতির মারপ্যাঁচ বা দলীয় পরিচয়ের কারণে অনেক সময় পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এই সুরক্ষা অপরাধীদের বেপরোয়া করে তোলে।
- দারিদ্র্য ও বাসস্থান সংকটের ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যেখানে একাধিক পরিবার একটি ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে থাকে, সেখানে শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় থাকে না এবং নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে
ঘটনার সাধারণ বিষয়সমূহ ও ঝুঁকি (Common Patterns) হিসেবে গবেষণা ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের আলোকে শিশু ধর্ষণের ঘটনার ক্ষেত্রে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়
- পরিচিতজনের সংশ্লিষ্টতা: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ধর্ষক ভুক্তভোগীর পরিচিত, অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়, প্রতিবেশী বা শিক্ষক।
- সামাজিক ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতা: অনেক অভিভাবক যৌন শিক্ষা বা বিষয়গুলো নিয়ে সন্তানদের সাথে খোলামেলা কথা বলেন না, যার ফলে শিশুরা অনেক সময় বিপদের সংকেত বুঝতে পারে না। এছাড়া পরিবারের সাথে শিশুর আস্থার সম্পর্ক কম থাকলে শিশুরা নির্যাতনের ঘটনা গোপন রাখে।
- ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটে অপরিচিত ব্যক্তিদের ফাঁদে পড়ে অনেক শিশু যৌন হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হচ্ছে।
- আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: বিচার ব্যবস্থার জটিলতা এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, যা সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
- মানসিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: অপরাধীকে বয়কট করার চেয়ে অনেক সময় ভুক্তভোগীকে সামাজিক কলঙ্ক ও দোষারোপের সম্মুখীন হতে হয়, যা বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং অপরাধীদের উৎসাহিত করে।
যেসকল উদ্যোগ আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় ভূমিকা রাখতে পারে।
- সুরক্ষা কমিটি: স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে প্রতিটি ওয়ার্ডে বা পাড়ায় শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করা। এতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক এবং নারীদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
- সচেতনতা ক্যাম্পেইন: স্থানীয় মিডিয়া বা অনলাইনে সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক কন্টেন্ট প্রচার। এর মাধ্যমে অভিভাবকদের মধ্যে যৌন শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
- সহায়তা কেন্দ্র বা হেল্পলাইন: আমরা ব্যক্তিগত বা সামাজিক উদ্যোগে ভুক্তভোগীদের আইনি ও মানসিক সহায়তা পাওয়ার জন্য একটি পরামর্শ কেন্দ্র বা হেল্পলাইন নম্বর চালু করতে পারি।কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা ও সাহস জোগাতে সরাসরি তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখা।
- স্কুল পর্যায়ে কর্মশালা: স্থানীয় স্কুলগুলোর সাথে যোগাযোগ করে ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’ বা ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিয়ে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করতে পারি।এতে শিশুরা ছোট থেকেই সচেতন হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে বর্তমানে বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এবং ভুক্তভোগীদের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।সেটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব আমাদেরও নিজের পরিবার, সমাজের প্রতি দায়িত্ব থাকা উচিত।কারন রাষ্ট্র আমাদের সেভাবে আস্থা অর্জন করতে পারছে না।তাই প্রশ্নটা মনে থেকেই যায়।ভয়, আতংকে ঘেরা আমাদের এই জীবন ও জনপথকে কি আমরাই পারিনা নিরাপদ করে গড়ে তুলতে।শিকারিরা ঘুরছে আপনার আমার আমাদের চারপাশেই এরা নতুন শিকারের খোজে।তার আগেই আমাদেরকেই উদ্যোগ নিতে হবে আমাদের সন্তানদের আমাদেরই বাঁচাতে হবে।প্রতিটি শিশু আমাদেরই সন্তান।আমাদের সন্তানদের নিরাপদ জীবনব্যবস্থা আমাদেরকেই গড়ে দিতে হবে, আমাদেরকেই উদ্যোগ নিতে হবে।আসুন আমাদের সুরক্ষায় আমরাই উদ্যোগগ্রহন করি।
________মুহাম্মদ মাসুদ রানা
আহবায়ক- নাগরিক বন্ধু, মুন্সিগঞ্জ
সাবেক সাধারণ সম্পাদক জেলা ছাত্রদল, সাবেক সদস্য সচিব- জেলা যুবদল,

